বুধবার,১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে নতুন দিগন্ত: ১,১৮৩ কোটি টাকার পিএবি-টইটং সড়ক, কমবে ৪০ কিমি পথ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের দীর্ঘদিনের যানজট, সংকীর্ণতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে অবশেষে বাস্তবায়নের পথে বহুল প্রতীক্ষিত পিএবি-টইটং আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্প। প্রায় ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া এই সড়ক দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের অনেক অংশ এতটাই সরু যে পাশাপাশি দুটি বড় যানবাহনের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে সাইড দিতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় চালকদের। দীর্ঘদিন ধরে এই সড়ককে চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরই মধ্যে বিকল্প সড়ক হিসেবে পিএবি-টইটং প্রকল্প নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারার কালাবিবির দিঘী থেকে কক্সবাজারের ঈদমনী (মাতামুহুরী) পর্যন্ত ৫৮ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্ত করা হবে। বর্তমানে যেসব অংশের প্রস্থ ১৮ ফুট, সেগুলো বাড়িয়ে ৩৪ ফুট করা হবে।
এই সড়ক চালু হলে আনোয়ারা ও বাঁশখালী হয়ে কক্সবাজারের পেকুয়ার টইটংয়ে বিদ্যমান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হবে। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী বাসসহ ভারী যানবাহন নগরী এড়িয়ে কর্ণফুলী টানেল ব্যবহার করে সহজেই চলাচল করতে পারবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি বিকল্প সড়কই তৈরি হবে না; বরং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পায়নের সম্ভাবনার সঙ্গে একটি কার্যকর যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে আনোয়ারায় গড়ে ওঠা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলও সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে।
গত ৯ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী জুলাইয়ে কাজ শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণ শেষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্পটি শেষ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি চালু হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার এবং ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে যাতায়াতের সময় ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে।
এ ছাড়া প্রকল্পটি চালু হলে কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টানেলে প্রতিদিন ১৭ থেকে ১৮ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বর্তমানে দৈনিক মাত্র সাড়ে তিন হাজারের মতো যানবাহন চলাচল করছে। নতুন সড়ক চালু হলে টানেলের যান চলাচল ও আয়—উভয়ই বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারে সড়কপথে যাতায়াতে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পিএবি-টইটং সড়ক বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারে যাতায়াতের একটি কার্যকর বিকল্প পথ তৈরি হবে এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, প্রকল্পটি দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এই প্রকল্পকে সরকারের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন