বুধবার,১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনলাইনে ‘পার্টটাইম চাকরি’র প্রলোভন, ধাপে ধাপে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

ঘরে বসে পার্টটাইম কাজ করে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ধাপে ধাপে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি অনলাইন চক্রের বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রথমে সম্ভাব্য কর্মীদের যোগাযোগে আনা হয়। পরে কথিত ‘রিসেপশনিস্ট’ ও ‘অনলাইন মেন্টর’ পরিচয়ে তাদের বিভিন্ন ধাপে টাকা জমা দিতে বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি পাওয়া কয়েকটি স্ক্রিনশট ও অনলাইন কথোপকথনে এমন একটি প্রতারণার কৌশলের চিত্র উঠে এসেছে। বিজ্ঞাপনে ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীদের জন্য ঘরে বসে কাজের সুযোগ, কোনো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই এবং শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই দৈনিক ১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব—এমন দাবি করা হয়েছে।
প্রথমে অল্প টাকা, পরে বাড়তে থাকে অর্থের পরিমাণ
প্রাপ্ত কথোপকথন অনুযায়ী, প্রথমে মাত্র ৫০০ টাকা জমা দিয়ে ‘VIP 2’ পর্যায়ের কাজ শুরু করার কথা বলা হয়। ১০টি অর্ডার সম্পন্ন করলে প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা পাওয়া যাবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়।
এরপর কথিত ‘হাই-কমিশন অর্ডার’ দেখিয়ে আরও টাকা জমা দিতে বলা হয়। একপর্যায়ে ৩১৩ টাকা, পরে ১ হাজার টাকা এবং ধাপে ধাপে আরও বড় অঙ্কের অর্থ ‘অর্ডার পার্থক্য’ বা ‘রিচার্জ’ হিসেবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একটি কথোপকথনে অর্ডার সম্পন্ন করার জন্য ৪ হাজার ৬৬১ টাকা রিচার্জ করতে বলা হয় এবং এর মাধ্যমে ৮ হাজার ৯৬৯ টাকার বেশি লাভ পাওয়ার কথা জানানো হয়। পরবর্তী ধাপে আবার ৯ হাজার ৬৪৬ টাকা রিচার্জ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
টাকা উত্তোলনের আগেও নতুন শর্ত
অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের নির্দিষ্ট পর্যায়ের সব অর্ডার সম্পন্ন না করলে অ্যাকাউন্টে জমা থাকা টাকা বা কথিত লাভ উত্তোলন করা যাবে না বলে জানানো হয়। ভুক্তভোগীর অ্যাকাউন্টে বড় অঙ্কের অর্থ দেখানোর পরও নতুন অর্ডার কিংবা উচ্চমূল্যের অর্ডারের কথা বলে আরও অর্থ জমা দিতে বলা হচ্ছে।
কোনো ব্যক্তি অর্থ দিতে অপারগতার কথা জানালে তাকে সাময়িকভাবে অর্থের ব্যবস্থা করার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিয়ে অর্ডার সম্পন্ন করতে পারলেই পরবর্তীতে মূল টাকা ও লাভ একসঙ্গে উত্তোলন করা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাকরি বা অনলাইন আয়ের নামে প্রথমে সামান্য অর্থ জমা নেওয়া এবং পরে বিভিন্ন অজুহাতে ক্রমাগত বড় অঙ্কের টাকা জমা দিতে বাধ্য করার কৌশল অনলাইন প্রতারণার পরিচিত একটি ধরন। বিশেষ করে ‘টাকা তুলতে হলে আগে টাকা দিতে হবে’—এমন শর্তকে বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত।
কমিশন, বোনাস ও দামি উপহারের প্রলোভন
ভুক্তভোগীদের আস্থা অর্জনের জন্য বড় অঙ্কের কমিশন, বোনাস ও পুরস্কারের কথাও বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কথোপকথনে একই দিনে তিনটি VIP পর্যায়ের কাজ শেষ করলে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা বোনাস, পূর্ণকালীন কর্মী হওয়ার সুযোগ এবং আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সসহ বিভিন্ন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব আকর্ষণীয় অফার দেখিয়ে একপর্যায়ে তাদের আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়।
প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো ব্যবহারের অভিযোগ
প্রাপ্ত কিছু বিজ্ঞাপন ও ছবিতে বিকাশ, Daraz এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম ও লোগো ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো বৈধ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এসব স্ক্রিনশট বা কথোপকথনের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কথোপকথনে ‘Jannatul Ferdous Asha’ ও ‘Munni’ নাম ব্যবহার করে কথিত রিসেপশনিস্ট বা মেন্টর হিসেবে যোগাযোগের উদাহরণও পাওয়া গেছে। তবে এসব নামধারী ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয়, তারা কোথায় অবস্থান করছেন কিংবা কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আইনগত ব্যবস্থা ও জনসচেতনতার দাবি
এ ধরনের অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন চাকরি বা বিনিয়োগের বিজ্ঞাপনে সহজে বিশ্বাস না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে কোনো চাকরির জন্য আগে টাকা জমা, রিচার্জ, VIP ফি, অর্ডার সম্পন্নের টাকা, নিরাপত্তা জামানত কিংবা টাকা উত্তোলনের আগে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হলে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতারক চক্রের ফাঁদ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত নজরদারি এবং কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন