শনিবার,২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিরাজগন্জের প্রানপুরুষ মির্জা মোরাদুজ্জামানের আজ ৩১তম মৃত্যবার্ষিকী

সিরাজগঞ্জ সদর থানাধীন কাওয়াকোলা ইউনিয়নের অর্ন্তগত কুড়িপাড়া গ্রামে ১৯৩৯ সালের ১১ই মার্চে এক সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারে মির্জা মোরাদুজ্জামান জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মির্জা জহিরউদ্দিন ছিলেন তদানিন্তন কংগ্রেস আন্দোলনের একজন স্থানীয় নেতা। মির্জা মোরাদুজ্জামান সিরাজগঞ্জ মুসলিম হাই স্কুলে ছাত্রাবস্থায় প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়েন এবং এসএসসি পাশের পর সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ৫২’র ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই রাজনীতিতে সক্রিয়তা বেড়ে ওঠে।
তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। সিরাজগঞ্জ মহকুমা ন্যাপের সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিড়ি-শ্রমিকদের সংগঠন ও রিক্সা-টমটম গাড়ি শ্রমিকদের সংগঠিত করেন এবং উক্ত ২টি সংগঠনের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে মির্জা মোরাদুজ্জামান শ্রমিক নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি ছিলেন সৎ, দায়িত্ববান এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের মধ্যে বিড়ি শ্রমিকদের সংগঠিত করে তাদের বাঁচার দাবী পাট- সমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জে জুটমিল প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের ফলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল আজম খান সিরাজগঞ্জে আসেন এবং নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনার পর কওমী জুট মিল প্রতিষ্ঠার পর বহু বেকার বিড়ি শ্রমিক জুট মিলে চাকরি পায়। ১৯৬৩ সালে মিল শ্রমিকদের নিয়ে কওমী মজদুর ইউনিয়ন গঠনেও তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালে কওমী শ্রমিক নেতৃবৃন্দ কারাগারে গেলে তিনি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই সময় সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি সিরাজগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে বিপুল ভোটে সদস্য নির্বাচিত হন এবং কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বিডি মেম্বর নিবাচিত হন।
১৯৬৭ সালে আইয়ুব খান এবং পাক গভর্ণর মোনায়েম খান বিরোধী শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে মির্জা মোরাদুজ্জামান সহ ১৭জন নেতা কর্মী গ্রেফতার হন। দীর্ঘ ১১ মাস কারা ভোগের পর তিনি আবারো রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মির্জা মোরাদুজ্জামান অকুতোভয় নেতা মাওলানা ভাসানীর রাজনীতিকে উর্ধ্বে তুলে ধরেন। তিনি ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ নিরীহ বাঙ্গালীদের হত্যা যজ্ঞে মেতে উঠে। এ সময় মির্জা মোরাদুজ্জামান মাওলানা ভাসানীর সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে
অংশগ্রহণ এবং বর্হিবিশ্বের স্বাধীনতার পক্ষে চাপ সৃষ্টির জন্য চীনে যাওয়ার পথে আসামে পৌঁছালে ভারত সরকারের  অনুরোধে স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতার জন্য মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে ভারতে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৬ সালে মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করলে মির্জা মোরাদুজ্জামান ভাসানী ন্যাপ বিলুপ্ত হওয়ার পর বিএনপি গঠনে প্রতিষ্ঠা কালীন সময়ে ওতপ্রতোভাবে জড়িয়ে পড়েন। মির্জা মোরাদুজ্জামান বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির প্রথম আহবায়ক কমিটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান এবং সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ও পরবর্তীতে তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক, সর্বশেষে তিনি বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পদকের দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা মোরাদুজ্জামান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৯ সালে সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়া-৪ আসনে ধানের শীষে বিএনপি মনোনীত জাতীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিদন্দ্বিতা করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন।
সেই সাথে ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় থাকার কারণে স্বৈরাচারের স্থানীয় দোসরদের ষড়যন্ত্রে দৈহিক নির্যাতন ও কারা নির্যাতন ভোগ করেন।
স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত সিরাজগঞ্জ সদর আসন থেকে মির্জা মোরাদুজ্জামান ধানের শীষে বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহনের পর সার্বজনীন কাজের দিকে তিনি নজর দেন।
মির্জা মোরাদুজ্জামান মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য, শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। জনপ্রতিনিধি হিসাবে মির্জা মোরাদুজ্জামান অন্যদের চাইতে আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। আবালবৃদ্ধবণিতা সর্বশ্রেণী-পেশার মানুষ তার কাছে অবাধে যেতেন এবং তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা, সমস্যার কথা অকপটে বলতে পারতেন। সে কারণে তিনি হয়েছিলেন সবার প্রিয় “মুরাদ ভাই”।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহযোগিতায় বিএনপি সরকারের সময় স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা, কবরস্থান, স্ব-শান, মন্দির-গীর্যা, রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণে তার সক্রিয় সহযোগীতা কালের সাক্ষী হিসাবে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
সিরাজগঞ্জ সরকারী কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রুপান্তর ও অনার্স-মাষ্টার্স কোর্স চালু করেন। বাণিজ্য ভবন, ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণসহ ভাসানী ডিগ্রী কলেজ, যমুনা ডিগ্রী কলেজ, শিমলা ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাগবাটি ডিগ্রী কলেজ এম.পি.ও ভুক্ত করা সহ প্রতিটি কলেজে প্রশাসনিক কাঠামো ও ভবন নির্মাণ করেন।
এছাড়াও শহীদ শামসুদ্দিন ষ্টেডিয়াম, সদর হাসপাতাল আধুনিকিকরণ, নার্সিং ট্রেনিং ইন্সষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, সিরাজগঞ্জ বার ভবন ও যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
মৃত্যুব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলে তাঁকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বোম্বে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়। সেখানে অল্প কিছুদিন চিকিৎসার
পর তিনি দেশে ফিরে আবারো অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি মৃত্যু পথযাত্রী হয়েও নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে জাতীয় সংসদে ১০ জুলাই ১৯৯৫ সালে জীবনের শেষ বক্তব্যে সরকারের কাছে নিজের এলাকার জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের কথা, উন্নয়নের কথা, উন্নয়নের মাঝে বেঁচে থাকার কথা বলেছেন এবং বাংলাদেশে একটি আধুনিক ক্যান্সার ইন্সষ্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে দাবী উত্থাপন করেন।
তিনি ১৯৯৫ সালের ১৮ জুলাই ভোরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরন করেন। মৃত্যুর পর হেলিকাপ্টার যোগে তাঁর মরদেহ সিরাজগঞ্জে আনা হলে সর্বজনবিদিত প্রিয় নেতার মুখ শেষ বার দেখার জন্য শোকার্ত মানুষের ঢল নামে।
প্রবীণ জননেতা সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মরহুম মোতাহার হোসেন তালুকদারসহ জেলার সব দলের নেতৃমন্ডলী সেই শোক সমাবেশে স্মৃতিচারণ করে আবেগ ঘন বক্তব্য রাখেন।
মরহুম মির্জা মোরাদুজ্জামানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সম্মানে সিরাজগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাণিজ্য ভবনকে মির্জা মোরাদুজ্জামান ভবন, সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে সম্প্রসারিত ভবনকে মির্জা মোরাদুজ্জামান ভবন, সিরাজগঞ্জ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে মির্জা মোরাদুজ্জামান বাস টার্মিনাল (মিরপুর), সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের কয়েকটি রাস্তার নামকরন করা হয়।
তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বাণী প্রেরণ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সংসদ উপনেতা বি. চৌধুরী, বিএনপির মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, প্রতিমন্ত্রী ব্যারিষ্টার আমিনুল হক, সাদেক হোসেন খোকা, আমানউল্লাহ আমান, রাশেদ খান মেনন ও ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন প্রমুখ।
মির্জা মোরাদুজ্জামানের মরদেহ মালশাপাড়া কবরস্থানে তাঁর ছোট ভাই শহীদ কমরেড মানিরুজ্জামান তারা’র কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়।
কমরেড মনিরুজ্জামান তারা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পর আওয়ামী দুঃশাসন একদলীয় বাকশাল গঠনের বিরুদ্ধে বামপন্থী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে গ্রেফতার এবং কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের করে এনে রক্ষী বাহিনী ক্যাম্পে মানষিক ও শারীরিক ভাবে নির্যাতনের পর রাতের অন্ধকারে স্থানীয় মালশাপাড়া কবরস্থানের পাশে সিরাজগঞ্জ স্টেডিয়াম রোড বর্তমানে যেটি শহীদ কমরেড মনিরুজ্জামান তাঁরা সড়ক হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে সেই রোডে এনে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মৃত্যুকালে মির্জা মোরাদুজ্জামান-স্ত্রী মনোয়ারা বেগম এবং দুই পুত্র ও তিন কন্যা সহ আত্মীয়-স্বজন এবং বহু গুনগ্রাহী রেখে যান।
তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মির্জা মোস্তফা জামান জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সিনিয়র সদস্য, সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও সর্বদলীয় ছাত্র-ঐক্য জেলা শাখার আহবায়ক এবং সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক পরবর্তীতে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক এর দায়িত্ব পালন করেছেন।
মির্জা মোস্তফা জামান বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন