শিক্ষার মান উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশ আন্তর্জাতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে নৈতিকতা, মানবিকতা, সত্য ও সাম্যের চেতনায় নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মাদক, নেশা, অন্যায়, দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) টাঙ্গাইলের পাহাড়কাঞ্চনপুরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিএএফ শাহীন কলেজে আয়োজিত ‘কাব্য ও ছন্দে নজরুল’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী।
তিনি বলেন, একটি জাতির অগ্রগতির জন্য মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। মাদক, নেশা ও নানা ধরনের সামাজিক অনাচার তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই এসবের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে অন্যায়, দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে মানবতা, সত্য ও সাম্যের মূল্যবোধকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, মানবতা, সত্য ও সাম্যের বিজয়ই একটি সুন্দর ও কল্যাণমুখী সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, দর্শন ও চেতনার বিভিন্ন দিক নিয়েও বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা, সাহস ও ত্যাগের চেতনা জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। নজরুলের সাহিত্য ও চিন্তাধারায় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে বার্তা রয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। ‘কাব্য ও ছন্দে নজরুল’ শীর্ষক আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা আয়োজনটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি বীর উত্তম সুলতান মাহমুদ, সখীপুর, টাঙ্গাইলের এয়ার অধিনায়ক এয়ার কমডোর মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া, বিইউবি, এনডিসি, এনএসডব্লিউসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএএফ শাহীন কলেজের অধ্যক্ষ গ্রুপ ক্যাপ্টেন মনজিলা রিজওয়ান, পিএসসি। এ সময় জেলা পুলিশ সুপার শামসুল আলম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ আশরাফুল আলম, এএসপি (সার্কেল) এস এম মামুনুর রশিদ, ওসি মোঃ মুরাদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম মাস্টার, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজিম উদ্দিন মাস্টারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্হিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বক্তব্যে আহমেদ আযম খান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এই ঘাঁটি এবং সখীপুর থানা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর দেশ গঠনে কাজ করে গেছেন। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর বিকাশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকার প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি বর্তমান সময়ে নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের শিক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রতিভাকে দেশ গঠনের কাজে কাজে লাগানোর আহ্বানও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
কাজী নজরুল ইসলামের অবদানকে মূল্যায়নের প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চেতনা, প্রতিবাদ, মানবিক দর্শনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নজরুল ইসলামের অবদানকে মূল্যায়ন করে তাঁর ৫০তম শাহাদাতবার্ষিকীকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নজরুলের সাহিত্য ও জীবনাদর্শ থেকে সাহস, প্রতিবাদ, মানবিকতা এবং সাম্যের শিক্ষা গ্রহণ করে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের সাফল্যের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এ আয়োজন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে আরও ভালো ফলাফল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে উৎসাহ জোগাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠান শেষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বিএএফ শাহীন কলেজ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ করেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরার অংশ হিসেবেই এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি ‘সুলতান মাহমুদ’, পাহাড়কাঞ্চনপুর, নলুয়া, সখীপুর পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি ঘাঁটির বিভিন্ন কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অবহিত হন। এর আগে দিনব্যাপী আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নজরুলচর্চা ও কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অতিথিদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। পুরো আয়োজনজুড়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশ গঠনের বার্তাই বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।


