মঙ্গলবার,২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে প্রভাবশালী নেতা খন্দকার মোশাররফ দুর্নীতির মামলায় কোণঠাসা, শতাধিক ব্যাংক হিসাব জব্দ

ফরিদপুরের একসময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। ঢাকার একটি আদালত তার নামে থাকা শতাধিক ব্যাংক হিসাব, এফডিআর ও ওয়েজ আর্নারস বন্ড জব্দের নির্দেশ দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল ‌
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার ৮৭টি এফডিআর হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দেন। এসব হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৭ লাখ ৯৬ হাজার ১২১ টাকা। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংক হিসাবে থাকা ৬৬ হাজার ৩৭৬ টাকা ও ১৬ হাজার ৪১৯ মার্কিন ডলার এবং ১ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ১৩টি ওয়েজ আর্নারস বন্ড জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দুদকের উপসহকারী পরিচালক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাবিকুন নাহারের আবেদনের ভিত্তিতে এই আদেশ দেওয়া হয়। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, খন্দকার মোশাররফ হোসেন জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন করেছেন। তদন্তে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩৫ কোটি ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৭ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুদকের তথ্যমতে, তার নিজের নামে ও ছদ্মনামে পরিচালিত ১৫টি ব্যাংক হিসাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯৯ কোটি ২১ লাখ ১৮ হাজার ৮৪২ টাকা এবং ১১ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৬ মার্কিন ডলারের লেনদেন হয়েছে, যা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৭ কোটি ৭২ লাখ ১৮ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপনের অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে, এসব অভিযোগে গত বছরের ২ জুন একটি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত চলমান থাকায় সম্পদ সরিয়ে ফেলার আশঙ্কায় আদালতের কাছে হিসাব জব্দের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী তার মোট ১০৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নজরদারিতে এসেছে।
একসময় ফরিদপুরের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। টানা তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা দীর্ঘদিন ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন।
তবে ২০২০ সালের পর থেকে তার রাজনৈতিক প্রভাব কমতে শুরু করে। ওই বছরের ৭ জুন ফরিদপুরে আলোচিত পুলিশি অভিযানে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা চলে যান এবং পরে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
দলের ভেতরেও তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয় এবং ২০২৩ সালের মে মাসে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য পদ থেকেও অপসারণ করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি কার্যত রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
বর্তমানে দুর্নীতির মামলা, সম্পদ জব্দ এবং বিদেশে অবস্থানের গুঞ্জন—সব মিলিয়ে একসময়কার প্রভাবশালী এই নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন