বৃহস্পতিবার,২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‎কুমারখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোয়ার্টার এখন ‘মৃত্যুফাঁদ’: ঝুঁকিতে চিকিৎসক-নার্স, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

‎১৯৭৮ সালে নির্মিত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টার গুলো এখন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে । কোয়ার্টার গুলোতে মোট ৩০ টি ইউনিট থাকা সত্ত্বেও বসবাস উপযোগী মাত্র হাতে  গোনা পাঁচ থেকে ছয়টি ইউনিট। প্রায় ৪৮ বছর আগে নির্মিত এই ভবন গুলোর উপযুক্ত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায়, ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে নষ্ট হচ্ছে আসবাবপত্র। এমন পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মচারী বসবাস করলেও, এখানে থাকছে না কোনো চিকিৎসক।যার ফলে জনসাধারণের চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটছে, তেমনি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পত্তি।
‎সরেজমিনে দেখা যায়, কোয়ার্টারের ভবনগুলো বাইরে থেকে দেখলে পরিত্যক্ত ভুতুড়ে বাড়ির মতো মনে হয়। দেয়ালজুড়ে আগাছা আর শ্যাওলার আস্তরণ। ১৯৭৮ সালে নির্মিত দুটি এবং ২০০৫ সালে নির্মিত তিনটি ভবনে মোট ৩০টি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৬টি ইউনিটে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজ খরচে মেরামত করে কোনোমতে বসবাস করছেন। বাকি ইউনিটগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
‎কোয়ার্টারে বসবাসরত স্বাস্থ্যকর্মী রঞ্জিত কুমার দাস ও শের-আলী জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যায়। দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে নিয়মিত। বিদ্যুৎ ও পানির লাইনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তারা আক্ষেপ করে বলেন, এখানে থাকার মতো পরিবেশ নেই। যে পরিমাণ ভাড়া গুনতে হয়, তার অর্ধেক টাকায় বাইরে ভালো বাসায় থাকা যায়। সংস্কার না করলে এখানে থাকা অসম্ভব।
‎নিয়ম অনুযায়ী, কোয়ার্টারে থাকার বিনিময়ে চিকিৎসকদের বেতন থেকে একটি বড় অংশ আবাসন খাত বাবদ কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু বসবাসের পরিবেশ না থাকায় কোনো চিকিৎসকই এখানে থাকছেন না। এতে সরকার যেমন বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি চিকিৎসকরা কর্মস্থলে অবস্থান না করায় জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
‎কুমারখালী ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুজয় চাকি বলেন, চিকিৎসকদের আবাসন নিশ্চিত না হওয়ায় জনসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি সম্পত্তিগুলো চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অথচ প্রশাসনের নজর নেই।
‎এসব সমস্যার বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন মুঠোফোন জানান আমরা পতি মাসিক মিটিংয়ে  জরাজীর্ণ ভবন গুলার অবস্থার কথা হেলথ ইউনিয়ন ডিপার্টমেন্টকে  জানায় তার এই গুলাকে সংস্কারের উপযোগী হলে সংস্কার করেন এবং যদি সংস্কার না করা যায় তাহলে পুনঃনির্মাণ কাজ করেন। হেলথ ইউনিয়ন ডিপার্টমেন্টকে জানানোর পরেও ভবনে এই বেহাল দশা কেন এ বিষয়ে তিনি কোন তথ্য দেননি।
‎কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই আবাসন সংকট নিরসনে এবং ভবনগুলোর আধুনিকায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হবে। জনস্বার্থে দ্রুতই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
‎স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যারা মানুষের জীবন বাঁচান, তাদের জীবনই যদি এমন ঝুঁকিতে থাকে তবে সেবার মান বজায় রাখা কঠিন। রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত এই কোয়ার্টারগুলো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
‎কোনো এক অদৃশ্য ভয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি কোয়ার্টারে থাকা নার্সরা। তবে গোপনে ধারণকৃত ভিডিওতে তাদের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, মাথার ওপর ছাদ ধসে পড়ার আতঙ্ক নিয়ে আমাদের ডিউটি শেষে ঘুমাতে হয়।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন