গাজীপুরের কালীগঞ্জে অনুমোদনহীন জ্যামের ফিলিংস ব্যবহার, বিএসটিআই (BSTI) লাইসেন্স জালিয়াতি এবং পণ্যের মোড়কে বাংলা ভাষার পরিবর্তে চাইনিজ ভাষা ব্যবহারের দায়ে ‘আইশিন ফুডস কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সোমবার (২০ জুলাই) বিকেলে উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের নাগরভেলা এলাকায় এই বিশেষ ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানটির নেতৃত্ব দেন কালীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাকিয়া সরোয়ার লিমা।
বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর সব তথ্য
আদালত ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পরিচালিত এই অভিযানে প্রতিষ্ঠানটিতে চরম অব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ খাদ্য আইনের একাধিক গুরুতর লঙ্ঘন ধরা পড়ে। তল্লাশিকালে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে:
ল্যাব রিপোর্ট ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি পাউরুটি: প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পাউরুটি বা ব্রেডের মেয়াদ দেওয়া হচ্ছিল ২০ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত। তবে এত দীর্ঘ সময় পাউরুটি কীভাবে ভালো থাকবে, সে বিষয়ে কোনো বৈধ ল্যাব রিপোর্ট তারা দেখাতে পারেনি।
বিএসটিআই লাইসেন্স জালিয়াতি ও অনুমোদনহীন ফিলিংস: প্রতিষ্ঠানটি যে ধরনের ব্রেড উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স নিয়েছিল, বাস্তবে তার মিল না রেখে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে পাউরুটি উৎপাদন করছিল। বিশেষ করে ব্রেডের ভেতরে একটি ‘জ্যাম ফিলিংস’ ব্যবহার করা হচ্ছিল, যার উপকরণের কোনো সঠিক ব্যাখ্যা বা বৈজ্ঞানিক তথ্য সংশ্লিষ্ট কেউ দিতে পারেননি। এই জ্যাম ব্যবহারের কোনো বিএসটিআই অনুমোদনও ছিল না।
আইন অমান্য করে চাইনিজ ভাষার ব্যবহার: কারখানায় ব্যবহৃত উপকরণের মোড়ক এবং সকল নির্দেশনা চাইনিজ ভাষায় লেখা ছিল, যা ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’-এর স্পষ্ট পরিপন্থী। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পণ্যের মোড়কে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক।
লাইসেন্সের ঘাটতি: অভিযানের সময় কারখানাটির হালনাগাদ কোনো ট্রেড লাইসেন্সও পাওয়া যায়নি।
জরিমানা আদায়
এসব অপরাধের দায়ে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ৩২(ক) এবং ৩৮ ধারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৩ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে উপস্থিত ইন্টারপ্রিটেশনাল মো. রিফাত (২৪) জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন।
“মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যেকোনো খাদ্য উৎপাদনের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর। আইশিন ফুডস কারখানায় বিএসটিআই লাইসেন্সের অপব্যবহার এবং ল্যাব রিপোর্ট ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি পাউরুটি তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া কারখানার নির্দেশাবলি চাইনিজ ভাষায় হওয়ায় এখানে কী মেশানো হচ্ছে তা সাধারণের বোঝার উপায় নেই। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের এ ধরনের কঠোর নজরদারি ও ঝটিকা অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।”
— জাকিয়া সরোয়ার লিমা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
স্বস্তিতে এলাকাবাসী
অভিযানে প্রসিকিউটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গাজীপুর জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য অফিসার ফারজানা ইয়াসমিন সোনিয়া। আদালত পরিচালনায় সহযোগিতা করেন বেঞ্চ সহকারী মাহবুবুল ইসলাম।
জনস্বার্থে পরিচালিত এই অভিযানের পর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এলাকার সচেতন মহল দাবি জানিয়েছেন, মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা এমন কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে যেন প্রশাসনের এই নিয়মিত তদারকি ও কঠোর অবস্থান বজায় থাকে।


