দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে স্থায়ী বিভাজন সৃষ্টি করা—পশ্চিমা বিশ্বে ঐক্য ভেঙে দিয়ে তাদের দুর্বল করা—ক্রেমলিনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কৌশল বলে মনে করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে রাশিয়া পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত দুর্বল করতে নাশকতা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে মস্কো তার ভৌগোলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সোভিয়েত আমলের ক্ষমতা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের পথে স্থায়ী বাধা হিসেবেও দেখে।
তাই তো পশ্চিমা বিশ্বের শক্তিশালী সামরিক জোট– ন্যাটো ভেঙে দেওয়া রাশিয়ার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষনীয়, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যা আরও তীব্র হয়েছে। মনে রাখতে হবে, ন্যাটোর সম্ভাব্য সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগকে সামনে রেখেই ক্রেমলিন প্রায় চার বছর আগে ইউক্রেনে তার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে কল্পনা করা যায়, ক্রেমলিনের ক্ষমতার অলিন্দে কতটা উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছে—যখন দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা ঐক্য ভাঙনের মুখে। কারণ ৮০ বছর ধরে রুশ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারী শক্তি ন্যাটো গ্রিনল্যান্ডের মালিকানার মতো এক বিস্ময়কর ইস্যুতে ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ভূখণ্ডের প্রতি যে অনাকাঙ্ক্ষিত আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
এই অবস্থায়, রাশিয়া যেন সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছে—তার পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীরা কীভাবে নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে।
ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতা করা ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নজিরবিহীন শুল্ক আরোপের হুমকি দেন, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কাল্লাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মন্তব্য করেন, “চীন ও রাশিয়া নিশ্চয়ই এই পরিস্থিতিতে দারুণ আনন্দ পাচ্ছে।”
চীন ও রাশিয়া উভয়ই গ্রিনল্যান্ডে তাদের কোনো ভূখণ্ডগত আকাঙ্ক্ষা আছে—এমন অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে। এমনকি ডেনমার্কের সামরিক বাহিনীও বলছে, পূর্ব দিক থেকে কোনো বড় ধরনের আগ্রাসনের আশঙ্কা তারা দেখছে না।
তবুও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ক্রেমলিনপন্থী বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডসংক্রান্ত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। তাদের মতে, এটি ন্যাটোর জন্য “একটি বিধ্বংসী আঘাত” এবং রাশিয়ার জন্য “অত্যন্ত লাভজনক”।
স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছে, ন্যাটো জোট যখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে এবং আন্তঃআটলান্টিক ঐক্য ভাঙনের মুখে, তখন ইউক্রেনের যুদ্ধপ্রচেষ্টার প্রতি পশ্চিমা সমর্থন দুর্বল হয়ে পড়বে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে মস্কোর আঘাত হানার সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিয়েভের জন্য এই মূল্যায়ন বাস্তব প্রমাণিত হতে পারে। যদিও এখনই বিজয়োল্লাসে ক্রেমলিনে শ্যাম্পেনের কর্ক খোলার সময় আসেনি।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে পশ্চিমা জোটের এই টানাপোড়েনের শুরুতে, মস্কো থেকে তুলনামূলকভাবে সংযত, এমনকি সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প “আন্তর্জাতিক আইনের সীমার বাইরে কাজ করছেন।”
কিন্তু, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মস্কোর কাছে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার নিজস্ব আধিপত্যের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
তবে ক্রেমলিনের উদ্বেগ আরও গভীর। তারা গোটা বিশ্বের মতোই অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে দেখছে—এক অনিশ্চিত ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রায় লাগামহীন ক্ষমতাকে বিশ্বব্যাপী প্রয়োগ করছে।
তাই তো নতুন বছরের প্রথম পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক ভাষণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, “কূটনীতি, আপস বা সবার জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার বদলে একতরফা ও বিপজ্জনক পদক্ষেপই এখন বেশি দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপের পরিবর্তে কিছু শক্তি জোর যার, মুলুক তার—এই নীতির ওপর ভর করে নিজেদের বয়ান চাপিয়ে দিতে চায়, অন্যদের শেখাতে চায় কীভাবে তাদের বাঁচতে হবে এবং ইচ্ছেমতো নির্দেশ জারি করে।” পুতিনের এই মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর প্রতি ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে মস্কোর বৈশ্বিক জোটব্যবস্থা—যা গত বছর রাশিয়াপন্থী সিরীয় শাসক বাশার আল-আসাদের পতনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল—দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর আরেক দীর্ঘদিনের মিত্র ইরান গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান চালানোর পর দেশটি আবারও হামলার মুখে পড়তে পারে, যা মস্কোপন্থী ইসলামি শাসকদের টিকে থাকাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
তাছাড়া চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয়ভাবে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে। মাদুরো ছিলেন ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাঁকে রক্ষা করতে না পারাকেও রাশিয়ার জন্য আরেকটি অপমানজনক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া কিউবা—রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী মিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ—ওয়াশিংটনের পরবর্তী ‘শাসক পরিবর্তন’ নীতির লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ওয়াশিংটন এমন ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই দিয়েছে, যা ক্রেমলিনের সামনে আরও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত অপমানের আশঙ্কা তৈরি করছে।
তবে পশ্চিমাদের দাবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে মস্কো দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমাদের একটি হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে অবজ্ঞা করে আসছে। এই ব্যবস্থাকে মস্কো দ্বিমুখী মানদণ্ডে ভরা এবং নিজেদের মতো প্রতিপক্ষকে দমন করার উপায় বলে মনে করে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত পরিবর্তনে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করে জাতিসংঘ সনদের বিধানকে মস্কো প্রকাশ্যেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এবং এমন এক বিশ্বের পক্ষে কথা বলেছে, যেখানে পরাশক্তিগুলো নিজেদের জন্য একচেটিয়া প্রভাববলয় দাবি করতে পারে।
এখন ওয়াশিংটনও ক্রমশ সেই রুশ দৃষ্টিভঙ্গির কাছাকাছি চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে—কাগজে-কলমে এটি মস্কোর জন্য একটি বড় কৌশলগত জয়।
তবে এই জয় উদ্যাপনের আনন্দ আপাতত স্থগিত। কারণ, সামনে কী ধরনের বিপজ্জনক নতুন বিশ্বব্যবস্থা আসছে, তা নিয়ে ক্রেমলিনের অলিন্দেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে ওঠা ট্রাম্পের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এমন এক ক্রেমলিনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যা এত দিন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে অভ্যস্ত ছিল।
রাশিয়ার প্রভাবশালী ট্যাবলয়েড মস্কভস্কি কমসোমোলেতস ট্রাম্পকে “পাগলাগারদের প্রধান চিকিৎসক” আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছে, “আমাদের মনে হচ্ছে, আশ্রমের প্রধান চিকিৎসক নিজেই পাগল হয়ে গেছেন, আর সবকিছু পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে পড়েছে।”




